ডিভোর্স নিয়ে আমি মাঝে-মধ্যেই হামজার সঙ্গে কথা বলি

ডিভোর্স নিয়ে আমি মাঝে-মধ্যেই হামজার সঙ্গে কথা বলি। অবশ্যই তার বয়স অনুযায়ী। অনেকেই ভাবেন, বাচ্চাদের এসব কিছু বলা উচিত না, যদিও আমি সেটা মনে করি না। আমি এই বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে দেখি। আমি চাই, আমার ছেলে যেন বাস্তবতা জানে কিন্তু সেই বাস্তবতার বোঝা যেন ওকে বহন করতে না হয়। এ কারণেই আমাদের কথাগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়। এমন না যে আমরা বসে “ডিভোর্স” নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা করি। বরং এমনভাবে কথা বলি, যেন বিষয়টা জীবনেরই একটা অংশ। কারণ আমি চাই না, বাইরের কেউ কোনোদিন এই বিষয়টা নিয়ে ওকে অপ্রস্তুত করে ফেলুক।

হামজা জানে তার আব্বু আর আম্মু একসঙ্গে থাকেন না। তার বাবার জীবনে কী হচ্ছে, সেটাও সে বয়স-উপযোগীভাবে জানে। আমি কী করছি, কেন করছি, সেটাও জানে। কিন্তু কখনোই বড়দের সমস্যা, অভিযোগ বা কষ্টের ভার আমি ওর কাঁধে চাপিয়ে দেই না। তার সঙ্গে নেতিবাচক কিছু নিয়েই কখনো কথা হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। এখন যেহেতু ওর বয়স প্রায় ৮ বছর, তাই মাঝে-মধ্যে আমরা ছোট্ট রোল-প্লে করি, যদি কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে, তাহলে কীভাবে উত্তর দেবে, সে বিষয়ে। তো সেই প্রসঙ্গে সপ্তাহখানেক আগের আমাদের কথোপকথন-

আমি: আচ্ছা হামজা, এই যে তোমার আব্বু-আম্মু একসঙ্গে থাকেন না, এটা নিয়ে যদি কেউ তোমাকে কিছু বলে, তাহলে তুমি কী বলবে?

হামজা: আমি ধমক দিয়ে বলব, “এত কথা বলো কেন? আব্বু-আম্মু একসঙ্গে থাকে না, সেটা জেনে তুমি কী করবে?”

এটা শুনে আমার চেহারা-

আমি: তুমি এই কথা বলবে?

হামজা: ইয়েস। আর শোনো আম্মু, তোমাকে যদি কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে, তুমিও ধমক দিয়ে দিও। ওকে?

এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। আমি ওকে কীভাবে প্রস্তুত করব ভাবছি, আর সে উল্টো আমাকে শেখাচ্ছে কী করতে হবে! মাঝে-মধ্যে মনে হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়টা ওর মন পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারেনি। আলহামদুলিল্লাহ 😛

…তারপর আবার নিজেকে মনে করাই- না, ঝড়টা পৌঁছেছে। শুধু আমি চেষ্টা করেছি, সেই ঝড়ের মধ্যে ওকে একা দাঁড় করিয়ে না রাখতে। কারণ একটা বিষয় আমি খুব তাড়াতাড়িই বুঝে গিয়েছিলাম- ডিভোর্স শিশুদের কষ্ট দেয়, কিন্তু অনেক সময় তার চেয়েও বেশি কষ্ট দেয় বড়দের আচরণ।

আমরা অনেকেই ভাবি, কিছুই বলব না, বাচ্চাদের থেকে সব লুকিয়ে রাখব। বাচ্চা বুঝবে না। কিন্তু জানেন, বাচ্চারা অবিশ্বাস্য রকমের পর্যবেক্ষক।

তারা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ বোঝে…

তারা নীরবতা বোঝে…

তারা কারও অনুপস্থিতি বোঝে…

তারা চোখের পানি না দেখেও মন খারাপ বুঝে ফেলে…

তারা যা বুঝে না, সেটা হচ্ছে- এগুলোর নাম কী, আর ব্যাখ্যা কী…

আর যখন আমরা কোনো ব্যাখ্যা দেই না, তখন তারা নিজেরাই একটা ব্যাখ্যা বানিয়ে নেয়। এটা ভয়ঙ্কর কেন জানেন? কারণ এই না-জানাটাকে অনেক শিশু মনে করে- “আমার জন্যই কি এমন হলো?”, “আমি কি কোনো ভুল করেছি?”, “আমি যদি আরেকটু ভালো হতাম!”

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তারা নিজেরাই বানিয়ে নেয়। আর সেই উত্তরগুলো অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও ভয়ংকর হয়।

তাই আমি বিশ্বাস করি, বয়স-উপযোগী সত্য বলা মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি। আমি কখনো হামজাকে বলিনি কে ঠিক, কে ভুল। আমি কখনো ওকে আমাদের সম্পর্কের বিচারক বানাইনি। আমি কখনোই ওকে বলিনি, “তুমি কেন বাবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে?” আমি শুধু চাই, ও একটা জিনিস সবসময় জানুক-

আব্বু-আম্মু একসঙ্গে না থাকলেও মা তার সঙ্গে আছে এবং বড়দের এই সিদ্ধান্তে ওর কোনো দোষ নেই। এবং আমার মনে হয়, এই আশ্বাসটুকু একটা শিশুর জন্য ভীষণ জরুরি।

আমি সাধারনত আমার ব্যক্তিগত জীবনের এই চ্যাপ্টার নিয়ে কিছু লেখা পছন্দ করিনা কিন্তু আজকের লেখাটার একটা কারণ আছে। আমি কিছুদিন আগে মায়েদের অনেক গ্রুপে বেশ কিছু পোস্ট দেখিছি, যেখানে প্রায়ই কোনো না কোনো আপু লিখেন যার সারমর্ম-

“শুধু বাচ্চার কথা ভেবে সম্পর্কটা টেনে নিচ্ছি।”

আমি কাউকে বিচার করছি না। প্রত্যেক সম্পর্কের গল্প আলাদা। প্রত্যেক মানুষের সামর্থ্য, ভয়, বাস্তবতা, সবই আলাদা। কিন্তু একটা প্রশ্ন আমরা নিজেদের করতে পারি। বাচ্চার জন্য কি আমরা সম্পর্কটা ধরে রাখছি, নাকি বাচ্চাকে প্রতিদিন এমন একটা পরিবেশে বড় করছি, যেখানে অসম্মান, অপমান, চিৎকার, নীরব যুদ্ধ কিংবা মানসিক নির্যাতন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে?

আমি আগেও বেশ অনেক লেখায় বলেছি, শিশুরা আমাদের কথা থেকে কম শেখে। আমাদের জীবন দেখে বেশি শেখে। আমরা যদি চাই, তারা ভবিষ্যতে সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ুক, তাহলে আজ তাদের সেই সম্মান দেখেই বড় হতে হবে। আমি এটা বলছি না যে ডিভোর্সই সমাধান। বরং আমি বিশ্বাস করি, একটি সুস্থ সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য যতটা চেষ্টা করা সম্ভব, তা অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু যখন সম্পর্কটা আর নিরাপদ থাকে না, যখন সেখানে সম্মান থাকে না, যখন প্রতিদিনের সহাবস্থান সবাইকে ভেঙে দেয়, তখন শুধু “বাচ্চার জন্য” সেখানে থেকে যাওয়াটা বেশিরভাগ সময় শিশুর জন্য ভালো সিদ্ধান্ত হয় না। একটা শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একসঙ্গে থাকা বাবা-মা নয়। তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ মানুষ। শান্ত একটা ঘর। ভালোবাসা। নিশ্চয়তা। আর এমন দুজন বড় মানুষ, যারা নিজেদের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে না পারলেও, সন্তানের প্রতি দায়িত্ব আর সম্মানটুকু ধরে রাখতে পারে।

হয়তো এ কারণেই আমি হামজাকে ডিভোর্স থেকে লুকিয়ে রাখিনি। আমি শুধু চেষ্টা করেছি, ওকে ডিভোর্সের আঘাত থেকে যতটা সম্ভব আগলে রাখতে।

দুটো জিনিস কিন্তু এক নয়।

#ConsciousParenting #ParentingAfterDivorce #DivorceAndChildren #ChildMentalHealth #PositiveParenting #HealingParenting #CoParentingJourney

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *